দেওয়ানগঞ্জে খুলাবাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয় যমুনা নদীর বিলীন, পাঠদান সবজি বাজারে

9

ফারুক মিয়া,জামালপুর প্রতিনিধি
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের চিকাজানি ইউনিয়নের খোলাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৪৩ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে খোলাবাড়ি বাজারের মাছ ও সবজি বিক্রির জন্য নির্ধারিত একটি শেডঘরে। নেই টিউবওয়েল ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নেই কোনো খেলার মাঠ। ব্ল্যাকবোর্ড, চক-ডাস্টার ও ঘরের বেড়া না থাকলেও শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ১৫টি বেঞ্চ। নানা সমস্যায় জর্জরিত এই বিদ্যালয়ের ৮ জন শিক্ষক একটি রুমে ছাত্রছাত্রীদের পড়াচ্ছেন।
দুই শিফটে চলা খোলাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২৪৩ জন। প্রতিদিন গড়ে উপস্থিত থাকে ১৫০ জন। এদের জন্য বেঞ্চ রয়েছে মাত্র ১৫টি। প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ১ম শিফট চলে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি দুপুর সাড়ে ১২ টা থেকে বিকেল সোয়া ৪টা পর্যন্ত।

এ বিদ্যালয়টিতে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস চলে একটি মাত্র রুমে। প্রতিটি ক্লাসের জন্য রয়েছে ৩টি করে বেঞ্চ। এক ক্লাসের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের কথাবার্তায় নষ্ট হচ্ছে অন্য ক্লাসের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মনযোগ। ক্লাস চলাকালীন সময়ে সৃষ্টি হওয়া শব্দদূষণে লেখাপড়া দূরে থাক, এখানে টিকে থাকাই দায়। কোনো ক্লাসেই ব্ল্যাকবোর্ড ও চক-ডাস্টার নেই। শিক্ষকদের পড়া বুঝাতে হয় হাতে বই উঁচু করে ধরে রেখে। অংক ক্লাসে কোনো শিক্ষার্থীর খাতায় অংক কষে সেই অংক একহাতে উঁচু করে ধরে বুঝাতে হয় ছাত্রছাত্রীদের। স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষকদের ল্যাট্রিনের কাজ সারতে হয় বাজারের পাশের কোনো বাড়িতে, ছাত্ররা যায় নদীর তীরে। ছাত্রীরা আশেপাশের কোনো বাড়িতে গেলেও কেউ ল্যাট্রিন নিয়মিত ব্যবহার করতে দেয় না।

ছাত্রছাত্রীদের পানি পান করতে হয় আশেপাশের কোনো খাবারের হোটেল থেকে। বাজারে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় এবং আশেপাশে কোনো খেলাধুলার মাঠ না থাকায় টিফিন পিরিয়ডে ছাত্রছাত্রীরা ঘুরাফেরা করে এদিক সেদিক। কেউ কেউ বাড়ি চলে যায় আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসে না।
চিকাজানি ইউনিয়নের চর বাহাদুরাবাদ, চিকাজানি, খোলাবাড়ি, চর ডাকাতিয়া, চর মাগুরের হাট গ্রাম ছাড়াও পাশের জেলা গাইবান্ধার ফুলছড়ি থানার এন্ডেরবাড়ি ইউনিয়নের ৩টি গ্রাম হরিচন্ডী, পাগলার চর ও তিনধোপা থেকেও এ বিদ্যালয়ে আসে ছাত্রছাত্রীরা। যমুনা নদী পার হয়ে আসে প্রায় ৫০জন শিক্ষার্থী। এন্ডেরবাড়ি ইউনিয়ন দেওয়ানগঞ্জের চিকাজানি ইউনিয়নের পাশের ইউনিয়ন হওয়ায় একমাত্র এই খোলাবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়য়ে পড়তে আসে তারা।

এবারের বন্যায় জুলাই মাসের ১৭ তারিখে নদীগর্ভে পুরোপুরি বিলীন হয় খোলাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের চৌহদ্দি ছেড়েও বাজারের কাছাকাছি চলে আসে যমুনা নদীর ভাঙন। বেশকিছুদিন বিদ্যালয়টি বন্ধ থাকলে খোলাবাড়ি বাজারের শেডঘরে ছাত্রছাত্রীদের পড়ার ব্যবস্থা করে দেয় এলাকাবাসী। ঈদের বন্ধের পর আগস্ট মাসের ২০ তারিখ থেকে এখানেই চালু রয়েছে বিদ্যালয়টির পাঠদান কার্যক্রম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ভাসমান অবস্থায় থাকলেও স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি কেউ। না ম্যানেজিং কমিটি, না উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন কিংবা উপজেলা প্রশাসন।

প্রধান শিক্ষক মরিয়ম কাউছার জানান, তিনি এই বিদ্যালয়ে যোগদান করেন ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর। এবারের বন্যায় বিদ্যালয়ের স্থাপনাসহ সবকিছু নদীগর্ভে বিলীন হলে বাজারের শেডঘরে পাঠদান চলছে। বিদ্যালয়টি পুনঃস্থাপনের জন্য এখনো কোনো জায়গা পাওয়া যায়নি। গত ৫ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে এলাকাবাসী ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের একটি সভা হয়েছে কিন্তু আশানুরূপ কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি চিকাজানি ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুল মান্নান জানান, বিদ্যালয়ের জায়গা নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনসহ সবার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। জায়গা পাওয়া গেলেই বিদ্যালয়টি শেডঘর থেকে স্থানান্তর করা হবে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আফতাব উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, আমি এ মাসেই যোগদান করেছি। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম মোস্তফাকে বিদ্যালয়টির পুনঃস্থাপনের বিষয়ে  জানানো হলে তিনি বলেন, শিক্ষা অফিস এখন পর্যন্ত আমাকে কোনো পত্র দেয়নি বিধায় বিদ্যালয়টি পুনঃস্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। এখনো নদী ভাঙন চলছে। বিদ্যালয়ের জমি বরাদ্দ কীভাবে করা হবে তা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি তবে শিক্ষা অফিস থেকে পত্র পেলেই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

Comments are closed.